চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আগমনের মধ্য দিয়ে ভারতে ব্রিকস সম্মেলন শুরু হচ্ছে; যুদ্ধ ও বাণিজ্য সংক্রান্ত উত্তেজনার দিকেই এখন বিশ্ববাসীর নজর
ঢাকা,(১২ সেপ্টেম্বর,২০২৬ খ্রি,(সময়ধারা নিউজ/সিনহুয়া) :ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। চীন সরকারের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট শি-রা সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে রয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইট এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী কর্মকর্তা কাই কি।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার চরম সংকটের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে উদীয়মান অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস-এর ১৮তম সম্মেলন। এই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব সম্মেলনে যোগ দিতে শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দুই দিনব্যাপী এই শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন তিনি। ২০১৯ সালের পর ভারতে এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম সফর।
১১টি রাষ্ট্রের এই শক্তিশালী জোটের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে একাধিক বিশ্ব সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর ও সংলগ্ন আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে বাণিজ্য বিঘ্নিত হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছেন ব্রিকস নেতারা।
ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি নিরাপত্তা, যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের বাজারে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতিতে।
২০২০ সালে, তিব্বত সীমান্তবর্তী বিতর্কিত হিমালয় অঞ্চলে দুই দেশের সৈন্যদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর, ভারত ও চীনের সম্পর্ক এক চরম তলার দিকে পৌঁছায়। প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার (২,১৭৫ মাইল) দীর্ঘ দুর্গম সীমান্তে এখনও দুই দেশই বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখে হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনর্বহাল, ভিসা প্রদান সহজীকরণ এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে।
সর্বশেষ শীর্ষ সফর, ২০১৯ সালের পর শি জিনপিংয়ের প্রথম ভারত সফর। সীমান্ত পরিস্থিতি,২০২০ সালের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর এখনও সীমান্তে বিপুল সেনা অবস্থান। সাম্প্রতিক অগ্রগতি, সরাসরি ফ্লাইট চালু, ভিসা প্রক্রিয়া শিথিল ও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা।বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধ, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি ও ভূ-কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানায়, তারা যোগাযোগ জোরদার, সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মতপার্থক্য সঠিকভাবে সমাধানের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
ছবি : সংগৃহীত
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গভীর অবিশ্বাস এখনও বিদ্যমান। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন-ভারত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রদীপ তানেজা জানিয়েছেন, সীমান্তে বিপুল সেনা মোতায়েন রেখে একই সাথে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলা সহজ নয়। উভয় দেশই সীমান্ত বিরোধের 'দ্রুত ও টেকসই সমাধান' চাইছে।
এদিকে শি জিনপিংয়ের এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে তিব্বতি নির্বাসিতদের ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা গেছে। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার অনুসারী ডজন ডজন তিব্বতি ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে চীনা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
সম্মেলনে যোগ দিতে শুক্রবারই নয়াদিল্লিতে পৌঁছান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
পুতিন-মোদি বৈঠক, শুক্রবার পুতিনের সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যবর্তী 'বিশেষ' সম্পর্ককে আরও জোরদার করার ওপর ঐকমত্য হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, ভারতের রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল কেনার কৌশল অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
ইরান সংকট ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সাথে বৈঠকে মোদি আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ চলাচল, বাণিজ্য রক্ষা এবং জাহাজের কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্ল্যাটফর্ম 'ব্রিকস', পশ্চিমা বিশ্ব শাসিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিপরীতে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করে চলেছে। তবে চলমান যুদ্ধের চাপ এবং নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কাটিয়ে ১১ সদস্যের এই শক্তিশালী জোট কতটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারে, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক মহলের দেখার বিষয়।






