আজ রাতে বাংলাদেশের আকাশে মহাজাগতিক আলোর খেলা: দেখা যাবে পারসেইড উল্কাবৃষ্টি
অন্ধকার আকাশে হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলোর রেখা—যুগ যুগ ধরে মানবজাতিকে মুগ্ধ করে আসা সেই অপরূপ মহাজাগতিক দৃশ্য আজ রাতে প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আজ বুধবার (১২ আগস্ট) রাতে দেশের আকাশজুড়ে দেখা মিলবে বহুল প্রতীক্ষিত 'পারসেইড উল্কাবৃষ্টি'। মহাজাগতিক ধূলিকণা ও ধূমকেতুর অবশেষ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় এই নয়নাভিরাম আলোর খেলা
দেখার সুবর্ণ সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ
প্রতিবছর আগস্ট মাসেই পারসেইড উল্কাবৃষ্টি দৃশ্যমান হয়। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এবারের অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে চমৎকার।
এর মূল কারণ অমাবস্যা। চাঁদ বর্তমানে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থান করায় রাতের আকাশ থাকবে সম্পূর্ণ অন্ধকার, যা উল্কা দেখার জন্য সবচেয়ে আদর্শ পরিবেশ তৈরি করবে। আকাশ মেঘমুক্ত ও যথেষ্ট অন্ধকার থাকলে আজ গভীর রাত থেকে আগামীকাল ভোর পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০টি পর্যন্ত 'ছুটন্ত তারা' বা উল্কা দেখা যেতে পারে।
আকাশে কোথায় ও কীভাবে দেখবেন?
উত্তর গোলার্ধ থেকে মধ্য-দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত এই উল্কাবৃষ্টি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
-
দিক নির্ধারণ: আগস্টে রাতের উত্তর-পূর্ব আকাশে উদিত হয় ‘পারসেয়াস’ নক্ষত্রমণ্ডল। এটি খুঁজে পেতে কষ্ট হলে ইংরেজি 'W' আকৃতির ‘ক্যাসিওপিয়া’ নক্ষত্রমণ্ডল চিহ্নিত করুন; এর ঠিক পাশেই মিলবে পারসেয়াস।
-
পর্যবেক্ষণের উপায়: এই দৃশ্য উপভোগ করতে কোনো টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলারের প্রয়োজন নেই। দ্রুতগতির উল্কা যন্ত্রে ধরা কঠিন, তাই খালি চোখে দেখাই সবচেয়ে উত্তম।
-
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি:
-
মাটিতে চাদর বিছিয়ে বা হেলানো চেয়ারে শুয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকাতে হবে।
-
অন্ধকারের সঙ্গে চোখ খাপ খাইয়ে নিতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় দিন।
-
দেখার সময় স্মার্টফোনের দিকে তাকানো থেকে একদম বিরত থাকুন; কারণ ফোনের কৃত্রিম সাদা আলো রাতের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয়।
-
নেপথ্যের মহাজাগতিক বিজ্ঞান
ছুটন্ত তারা হিসেবে পরিচিত এই আলো আসলে প্রকৃত কোনো নক্ষত্র নয়। এগুলো মূলত ছোট পাথরের কণা, যা বিজ্ঞানের ভাষায় 'মেটিওরয়েড'।
আমেরিকান মেটিওর সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, পারসেইডের উল্কাগুলো ঘণ্টায় প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ কিলোমিটার প্রকাণ্ড বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ভূমি থেকে প্রায় ৯৭ কিলোমিটার ওপরে বায়ুমণ্ডলের সাথে প্রচণ্ড ঘর্ষণে এগুলো জ্বলে ওঠে।
এই আলোর খেলার নেপথ্যে রয়েছে ১০৯পি/সুইফট-টার্টল (109P/Swift-Tuttle) নামের একটি ধূমকেতু। ২৬ কিলোমিটার ব্যাসের নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট এই ধূমকেতুটি সর্বশেষ ১৯৯২ সালে সৌরজগতের ভেতরের অংশে এসেছিল এবং ২১২৬ সালের আগে এটি আর ফিরবে না। ধূমকেতুটির রেখে যাওয়া ধূলিপথ দিয়ে পৃথিবী অতিক্রম করার সময়ই এই উল্কাবৃষ্টির সৃষ্টি হয়। মাঝেমধ্যে এতে অত্যন্ত উজ্জ্বল 'ফায়ারবল' বা অগ্নিপিন্ডের রূপও দেখা যায়।
আমেরিকান মেটিওর সোসাইটির ফায়ারবল রিপোর্ট সমন্বয়কারী রবার্ট লুনসফোর্ড জানান, ধূমকেতু থেকে যত বেশি কণা নির্গত হয়, ফায়ারবল তৈরির সম্ভাবনা তত বাড়ে।
উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে ঘটার কারণে মানুষ খোলামেলা পরিবেশে আরামে এটি উপভোগ করতে পারে। ফলে শীতকালীন অন্যান্য উল্কাবৃষ্টির তুলনায় পারসেইড বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।






