মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে খুন কঙ্গনার সহশিল্পী

মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে খুন কঙ্গনার সহশিল্পী
ছবি : সংগৃহীত
মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে খুন কঙ্গনার সহশিল্পী

ঢাকা, ২২ আগস্ট, ২০২৬  (সময়ধারা নিউজ ) : কৃত্তিকা চৌধুরীর মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটের ভেতরে তখনো টেলিভিশন চলছিল। এসির সুইচও অন করা ছিল। সদর দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। কৃত্তিকাকে কয়েক দিন ধরে কেউ দেখেননি। প্রতিবেশীরা যখন পচা গন্ধ পান, ততক্ষণে ২৭ বছর বয়সী এই অভিনেত্রী মারা গেছেন।

সময়টা ছিল ২০১৭ সালের ১২ জুন, বেলা আনুমানিক ৩টা ৪৫ মিনিট। আন্ধেরি ওয়েস্টের শ্রী ভৈরবনাথ এসআরএ সোসাইটির বাসিন্দারা তখন পুলিশকে খবর দেন।

পাঁচতলা ভবনের চারদিকে এক উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল, গন্ধটা ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে আসছে। ওই ফ্ল্যাটে কৃত্তিকা একাই থাকতেন। ভবনে ঢোকা বা বের হওয়ার সময় মাঝেমধ্যে তাঁকে দেখা যেত। এর বাইরে প্রতিবেশীরা তাঁর সম্পর্কে খুব একটা জানতেন না।

প্রতিবেশীরা শুনতে পাচ্ছিলেন, বাইরে থেকে তালা দেওয়া ওই ঘরের ভেতর টেলিভিশন চলছে।

সাব–ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত যাদব ও তাঁর দল ফ্ল্যাটে ঢোকেন। তাঁরা বিছানার ওপর কৃত্তিকার পচন ধরা মরদেহ দেখতে পান। তাঁর পরনে ছিল একটি নাইটগাউন। তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।

মরদেহের পাশেই রক্তমাখা একটি ‘ব্রাস নাকল’ (আঙুলে পরার ধাতব অস্ত্র) পড়ে ছিল। ফ্ল্যাটের ভেতর সাদা রঙের কিছু গুঁড়াও পাওয়া যায়। পুলিশের ধারণা, সেগুলো মাদক।

বিছানার কাছে পড়ে ছিল কৃত্তিকার মুঠোফোন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে পাওয়ার জন্য তখনো ফোনে কল করেই যাচ্ছিলেন।

কৃত্তিকার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল পরিবার

কৃত্তিকার ভাই দীপক চৌধুরীর সঙ্গে ওই বছরের ৮ জুন তাঁর শেষ কথা হয়। এর পর থেকে তিনি আর ফোন ধরেননি।

মৃত্যুর কিছুদিন আগেই কৃত্তিকা তাঁর ২৭তম জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছিলেন।

মরদেহ উদ্ধারের চার দিন আগে এক পুরোনো বন্ধু কৃত্তিকাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে খুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি।

‘মাথায় গুরুতর আঘাতেই কৃত্তিকার মৃত্যু হয়’

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণেই কৃত্তিকা মারা গেছেন। পুলিশি তদন্ত অনুযায়ী, তাঁর মাথায় তিনবার আঘাত করা হয়েছিল।

তবে যে-ই এই অভিনেত্রীকে খুন করুক না কেন, মনে হচ্ছিল সেই ব্যক্তি পালানোর জন্য কিছুটা সময় ক্ষেপণ করার চেষ্টা করেছিল।

হত্যাকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে তালা দেওয়ার আগে টেলিভিশন ও এসি চালু করে রেখে গিয়েছিল।

পুলিশের ধারণা, কারও যেন সহজে সন্দেহ না হয় এবং লাশ পচতে যেন দেরি হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এমনটা করা হয়েছিল।

তদন্তকারীরা ফ্ল্যাটের ভেতর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে পান। সেটি হলো, কৃত্তিকার রক্তমাখা একটি পুরুষের শার্ট। এই শার্টের সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত খুনের সময় ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়া দুই ব্যক্তির খোঁজ মেলে।

কৃত্তিকার ব্যক্তিগত জীবন নজরদারিতে আসে

চেনা এক স্বপ্নের পেছনে ছুটেই মুম্বাইয়ে এসেছিলেন কৃত্তিকা। উত্তরাখন্ডের হরিদ্বারের মেয়ে কৃত্তিকা প্রথমে দিল্লিতে যান। সেখানে তিনি একটি মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানিতে কাজ করতেন।

পরে কৃত্তিকা বিয়ে করেন এবং ২০১১ সালে মুম্বাইয়ে চলে আসেন। তাঁর এই বিয়ে টেকেনি।

খবর অনুযায়ী, দিল্লিতে কাজ করার সময় হবু স্বামী বিজয় দ্বিবেদীর সঙ্গে কৃত্তিকার পরিচয় হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, বিজয় আগে থেকেই বিবাহিত।

শোনা যায়, বিজয় তাঁর প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করে কৃত্তিকাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বিজয় তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করছেন—এমনটা জানতে পারার পর তাঁরা আলাদা হয়ে যান।

পরে অন্য একটি চাঁদাবাজির মামলায় বিজয় দ্বিবেদী গ্রেপ্তার হন।

শ্বেতা তিওয়ারি ও গোবিন্দর মতো তারকাদের সঙ্গে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগেও তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়।

কৃত্তিকার মৃত্যুর ছয় মাস আগে বিজয় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি সম্পর্কটি নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কৃত্তিকা রাজি হননি।

পুলিশ ওই বছরের ২৩ জুন বিজয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে তদন্তের মোড় খুব দ্রুতই অন্যদিকে ঘুরে যায়।

বিবাহবিচ্ছেদের পর কৃত্তিকা অভিনয় ও মডেলিংয়ের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেন।

তিনি ‘পরিচয়’ ও ‘সাবধান ইন্ডিয়া’–এর মতো টেলিভিশন শোতে অভিনয় করেন। বালাজির কয়েকটি প্রোডাকশনেও কাজ করেন। এ ছাড়া ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রাজ্জো’ সিনেমায় তিনি কঙ্গনা রনৌতের বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

‘কৃত্তিকা বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন’

কৃত্তিকার এক পুরোনো বন্ধু ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম দ্য কুইন্টকে বলেন, কৃত্তিকা মাদকাসক্ত ছিলেন। তিনি বেশ কয়েকবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলেন। ওই বন্ধু আরও বলেন, কৃত্তিকার হাতের কবজিতে কাটা দাগ ছিল। একবার তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার হুমকিও দিয়েছিলেন।

ওই সময় বন্ধুটি মুম্বাইয়ের বাইরে ছিলেন। তিনি কৃত্তিকাকে সাহায্য করতে নিজের ভাইকে পাঠিয়েছিলেন।

ওই বন্ধুর ভাই যখন সেখানে পৌঁছান, তখন নিচে ভিড় জমে গেছে। পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়ে গেছে। তিনি বুঝিয়ে কৃত্তিকাকে ছাদের ধার থেকে সরিয়ে আনেন। এরপর তাঁকে তাঁর ফ্ল্যাটে নিয়ে যান।

জানা যায়, এ ঘটনায় হাউজিং সোসাইটির সদস্যরা বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন। পরে কৃত্তিকা অন্য একটি ফ্ল্যাটে চলে যান। সেই সঙ্গে এই দুই নারীর বন্ধুত্বও শেষ হয়ে যায়।

সিসিটিভি ফুটেজে পাল্টে গেল দৃশ্যপট

তদন্তকারীরা যখন কৃত্তিকার শেষ দিনগুলো মিলিয়ে দেখছিলেন, তখন তাঁর ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ প্রথম বড় কোনো সূত্র এনে দেয়। যে সময়টায় কৃত্তিকাকে খুন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই অপরিচিত দুই ব্যক্তিকে তাঁর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় ক্যামেরায়।

কৃত্তিকার ভাইও পুলিশকে জানান, কৃত্তিকার কিছু গয়না ও দামি জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছে না।

ফ্ল্যাটের ভেতর পাওয়া রক্তমাখা শার্টটি কার, তা বের করতে তদন্তকারীরা বিভিন্ন মানুষ ও দোকানিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। তল্লাশির সময় ওই শার্ট থেকে পাওয়া ডিএনএ-ও ব্যবহার করা হয়েছিল।

পুলিশ জানায়, ৮ জুন নাসিম বাসুদেবকে সঙ্গে নিয়ে আবার কৃত্তিকার ফ্ল্যাটে যান।

শুরুতেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠেনি। তদন্ত অনুযায়ী, তাঁরা তিনজন একসঙ্গে কথা বলেন এবং রাতের খাবারও খান। এরপর তাঁদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়।

পুলিশের অভিযোগ, নাসিম ফ্ল্যাটে আসার সময় একটি ব্রাস নাকল (আঙুলে পরার অস্ত্র) সঙ্গে করে এনেছিলেন। সেটা দিয়েই তিনি কৃত্তিকার মাথায় তিনবার আঘাত করেন। এই আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

তদন্তকারীরা জানান, নাসিম বদলানোর জন্য বাড়তি কাপড়চোপড়ও এনেছিলেন। কৃত্তিকার রক্তে শার্ট ভিজে গেলে তিনি সেটি খুলে ফেলে রেখে যান।

এরপর তাঁরা দুজন টেলিভিশন ও এসি চালু করে, বাইরে থেকে দরজা আটকিয়ে পালিয়ে যান।

সূত্রঃ এনডিটিভি