আঙুল ফোটালে কি সত্যিই কোন সমস্যা হয়?  বিজ্ঞানের চমকপ্রদ ব্যাখ্যা

কাজের ফাঁকে, একটানা টাইপ করার পর বা আনমনে হাত-পায়ের আঙুল ফোটানো অনেকেরই রোজকার অভ্যাস। আর এই কাজ করতে গেলেই ছোটবেলা থেকে গুরুজনদের কড়া ধমক শুনতে হয়— ‘আঙুল ফুটাস না, বড় হলে বাতের ব্যথা হবে বা হাড় ক্ষয়ে যাবে!’ কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই অনুশাসনের আদৌ কি কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? চিকিৎসা বিজ্ঞান কিন্তু এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চমকপ্রদ তথ্য দিচ্ছে।

আঙুল ফোটালে কি সত্যিই কোন সমস্যা হয়?  বিজ্ঞানের চমকপ্রদ ব্যাখ্যা

মট মট শব্দটা আসলে কিসের?

আমাদের শরীরের হাড়ের জয়েন্ট বা সংযোগস্থলে (যেমন- আঙুল, ঘাড় বা পিঠ) ‘সাইনোভিয়াল ফ্লুইড’ নামক একধরনের পিচ্ছিল তরল থাকে, যা জয়েন্টকে মসৃণ রাখে। যখন আমরা আঙুল বাঁকাই বা টানি, তখন জয়েন্টের ভেতরের ফাঁকা জায়গা সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে সেখানে থাকা তরলের চাপ কমে গিয়ে দ্রবীভূত গ্যাসগুলো বুদবুদের আকার ধারণ করে এবং পরক্ষণেই ফেটে যায়। আঙুল ফোটানোর সময় আমরা মূলত এই বুদবুদগুলো ফেটে যাওয়ার শব্দই শুনতে পাই! আল্ট্রাসাউন্ডে দেখলে একে জয়েন্টের ভেতর ছোট্ট আতশবাজি ফোটার মতো মনে হয়।

মার্কিন চিকিৎসকের সেই অদ্ভুত গবেষণা

আঙুল ফোটালে সত্যিই হাড়ের ক্ষতি বা বাত হয় কি না, তা প্রমাণ করতে ডোনাল্ড আঙ্গার নামের এক মার্কিন চিকিৎসক নিজের ওপরই এক অভিনব পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি টানা ৫০ বছর ধরে প্রতিদিন শুধু নিজের বাঁ হাতের আঙুল ফুটিয়েছেন (প্রায় ৩৬,৫০০ বার!), কিন্তু ডান হাতের আঙুল কখনো ফোটাননি।

৭২ বছর বয়সে দুই হাতের এক্স-রে করে তিনি দেখেন— তাঁর দুই হাতের অবস্থাই সম্পূর্ণ এক এবং কোনোটিতেই বাতের বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের কোনো লক্ষণ নেই! আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও একাধিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, নিয়মিত আঙুল ফোটানোর সঙ্গে জয়েন্ট মোটা হয়ে যাওয়া বা হাতের জোর কমে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

ঝুঁকি কোথায়? কখন সতর্ক হবেন?

সাধারণভাবে আঙুল ফোটানো নিরাপদ হলেও কিছু বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি:

  • অতিরিক্ত জোর প্রয়োগ: আঙুল ফোটাতে গিয়ে যদি তীব্র ব্যথা অনুভব করেন, হাত ফুলে যায় বা টান লাগে, তবে বুঝতে হবে ভেতরের টিস্যু বা টেন্ডন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জোর করে এই কাজ করা থেকে বিরত থাকুন।

  • ঘাড় বা পিঠ মটকানো বিপজ্জনক: আঙুল নিরাপদ হলেও ঘাড় বা পিঠ ইচ্ছেমতো মোচড়ানো মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে। আমাদের ঘাড়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল রগ, স্নায়ু ও গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী থাকে। অনভিজ্ঞ হাতে জোর করে ঘাড় মটকাতে গেলে বড় ধরনের স্নায়বিক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

অভ্যাস ছাড়বেন কীভাবে?

চিকিৎসকদের মতে, আঙুল ফোটানো শারীরিক প্রয়োজনের চেয়ে বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক অভ্যাস। অনেকেই স্ট্রেস কাটাতে, দুশ্চিন্তায় পড়লে বা নিছক অলস সময়ে এটি করে থাকেন। আপনি যদি নিয়মিত আঙুল ফোটানোর এই অভ্যাসটি ছেড়ে দিতে চান, তবে কাজের ফাঁকে হাতে একটি স্ট্রেস বল (Stress ball) বা ফিজেট খেলনা রাখতে পারেন। হাত ব্যস্ত থাকলে ধীরে ধীরে এই প্রবণতা কমে আসবে।